হাত দিয়ে ওঠানো যাচ্ছে যবিপ্রবির সড়কের কার্পেটিং, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
প্রকাশিত: 31 Mar, 2026
একটি সড়কের পিচের কার্পেটিং হাত দিয়ে টেনে তুলছেন একজন। তুলে নেওয়া সেই কার্পেটিংয়ের দলা হাতে নিয়ে সামান্য চাপ দিতেই তা গুড়ো হয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করছেন আরেকজন। ভিডিওতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলে সড়কটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায় তাদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়কটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) প্রধান ফটকের সড়ক, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের একমাত্র পথ। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা এই সড়ক দিয়ে যানবাহন কিংবা হেঁটে চলাচল করেন। কার্পেটিং তুলে ফেলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান ফটক থেকে কেন্দ্রীয় মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ সড়কটির নির্মাণকাজ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শুরু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সড়কটি সংস্কার, দুপাশে ড্রেন নির্মাণ, ফুটপাত কার্পেটিং এবং ব্লক বসানোর জন্য মোট ব্যয় ধরা হয় ৬৭ লাখ টাকা।
তবে কাজ শেষ হতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলে সমালোচনার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনার একটি ব্যানার সড়কে টানিয়ে দেয়।
ব্যানার অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মার্চ মাসেও তা সম্পন্ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কাজের বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে যবিপ্রবির রেজিস্ট্রার কাজী মো. জালাল উদ্দীনের সই করা এক চিঠিতে নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ ইমামকে ঈদুল ফিতরের আগে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় উপপ্রধান প্রকৌশলী নাজমুস সাকিবকে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, ফলে মান বজায় রাখা হয়নি।
মঙ্গলবার দুপুরে এই প্রতিবেদকের সামনে অনেক শিক্ষার্থী সড়কটির কার্পেটিং টেনে তুলে দেখান। বড় বড় খণ্ড আকারে উঠে আসা কার্পেটিং অনেকেই মুঠো করে চেপে গুড়ো করে ফেলেন।
জিইবিটি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিউল আলিম বলেন, “এক মিটার রাস্তার কাজ শত দিনেও ঠিকভাবে শেষ করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার না করে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে রাস্তা শক্ত হয়নি। দুর্নীতি ও অনিয়ম ছাড়া এমন কাজ সম্ভব নয়।”
সুস্মিতা সরকার নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “বিগত সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিচার না হওয়ায় এখনো তা চলমান রয়েছে। এই সড়ক তারই প্রমাণ। এখানে শুধু ঠিকাদার নয়, প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও জড়িত। আমরা এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিচার এবং সড়কটি নতুন করে সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।”
এদিকে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ ইমাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন না। মঙ্গলবারও তাকে তার দপ্তরে পাওয়া যায়নি।
তবে তিনি ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের জানান, ক্যাম্পাসে চলাচলকারী বিআরটিসি বাসগুলোর তেলের ট্যাঙ্কে লিকেজ থাকার কারণে ডিজেল পড়ে যেসব স্থানে পড়েছে, সেসব জায়গার কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে।
কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল বাশার বলেন, “কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী উপকরণ ব্যবহার করেই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে।”
প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, “আমরা সরেজমিনে দাঁড়িয়ে কাজ তদারকি করেছি। কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম হয়নি।”
তিনি আরও জানান, সড়কটির কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং কার্পেটিং উঠে যাওয়ার কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
যবিপ্রবির রেজিস্ট্রার কাজী জালাল উদ্দীন বলেন, “সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়টি আমরা অবগত। কোনো অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”