কেন জীবনের প্রতি এত অনীহা? হতাশার অন্ধকারে তরুণ প্রজন্ম
প্রকাশিত: 04 Nov, 2025
হতাশার অন্ধকারে তরুণ প্রজন্ম: মুক্তির পথ কোথায়?
তরুণদের মধ্যে কেন বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা সামনে এনেছে এক গভীর সামাজিক সংকটকে। মানসিক চাপ, ব্যর্থতা মেনে না নিতে পারা এবং ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে কীভাবে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে আজকের যুবসমাজ, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে এই প্রতিবেদন।
বহুতল ভবন থেকে শূন্যে ঝাঁপ দেওয়া আর কঠিন ভূমিতে স্পর্শ করার মাঝের সেই কয়েক সেকেন্ড—কী ভয়াবহ আতংক আর যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে সেই মুহূর্তে! সম্ভবত এই সময়েই মনে হয়, 'আমি এ কী করলাম!' কিন্তু কেন এই চরম পদক্ষেপ? সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্রীর আত্মহত্যার খবর, তার আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর একই পরিণতি—এসব ঘটনা আমাদের সমাজকে এক কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
কেন জীবনের প্রতি এত অনীহা?
জীবনের প্রতি এমন তীব্র বিতৃষ্ণা বা অনীহা হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে কাজ করে বহুবিধ কারণ। সাংবাদিক হিসেবে অসংখ্য দুঃখজনক ঘটনার সাক্ষী হয়ে দেখেছি, কীভাবে হতাশা একটি জীবনকে গ্রাস করে।
২.১. প্রেমের ব্যর্থতা: এক সর্বনাশা যন্ত্রণা
ষোল-সতেরো বছর বয়সে সহপাঠী বা পরিচিতজনের আত্মহত্যার ঘটনার কথা এখনো মনে পড়ে। তখন দেখেছি, বহু আত্মহত্যার কারণ ছিল 'সর্বনাশা প্রেম'। সম্পর্কে ছেদ, প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে বা প্রেমিকের প্রতারণা—এইসব কারণে তরুণ-তরুণীরা বেছে নেয় মরণের পথ।
এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন বারবার মনে আসে: যে মানুষটি আপনাকে ছেড়ে চলে গেল, তার প্রতি ভালোবাসা বা ঘৃণা কি আপনার প্রতি বাবা-মা, ভাইবোন ও বন্ধুদের ভালোবাসার চেয়েও বেশি হয়ে গেল?
২.২. অভিভাবকের অতিরিক্ত প্রত্যাশার বোঝা
আজকের তরুণ প্রজন্মের হতাশার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও মানসিক চাপ। ভালো ফলাফলের জন্য লাগাতার চাপ, এমনকি নাচ-গান-খেলাধুলা সবকিছুতেই সেরা হওয়ার নিরন্তর প্ররোচনা অনেক সময় বিপরীত ফল আনে।
নোট: 'অমুকের সন্তান জিপিএ ফাইভ পেল, তোমাকে পেতে হবে' বা ' ও বুয়েট/মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, তুমি পাওনি—তুমি ব্যর্থ' - এই ধরনের মন্তব্য সন্তানদের মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি করে। সবাই একরকম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় না, এবং সবার পক্ষে সেরা হওয়াও সম্ভব নয়।
ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার শিক্ষা কেন জরুরি?
সন্তানদের কেবল সফল হওয়ার শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ব্যর্থতাকে সহজভাবে মেনে নেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। এখানেই তৈরি হচ্ছে মানসিক দুর্বলতা।
ব্যর্থতা উদযাপন: সন্তানের ব্যর্থতাকে বকা না দিয়ে বলুন, 'আজকের ব্যর্থতাই কালকের সফলতার ভিত্তি। চলো, আজকের এই শিক্ষাটাকে সেলিব্রেট করি!'
প্রেমের ব্যর্থতা: প্রেমের বিফলতাও যে জীবনের শেষ নয়, তা বুঝতে শেখাতে হবে। কঠোরভাবে বাধা না দিয়ে বরং তাদের মনকে অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করতে হবে এবং জীবন গড়ার পরামর্শ দিতে হবে। সময় পেলে ভুল মানুষটিকে তারা নিজেরাই চিনতে পারবে।
ভার্চুয়াল দুনিয়া ও একাকীত্ব: নীরব ঘাতক
সাম্প্রতিক সময়ে হতাশা ও বিষণ্নতা বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হলো মানুষে-মানুষে সরাসরি যোগাযোগের অভাব। ভার্চুয়াল যোগাযোগ কখনওই বাস্তবের স্পর্শ, দৃষ্টি ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজের জায়গা নিতে পারে না।
৪.১. সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিযোগিতার ফাঁদ
ফেসবুকে যখন দেখি কেউ দামি রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে, বিদেশ ঘুরছে বা পুরস্কার পাচ্ছে—তখন নিজেকে 'ব্যর্থ' মনে হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা কেবল একজন মানুষের খণ্ডিত জীবন দেখি। ওই আপাত-সফল মানুষটিরও হতাশা, ব্যর্থতা, মেজাজ খারাপ হওয়া বা বসের কাছে ধমক খাওয়ার মতো সাধারণ সমস্যা আছে। এই 'সুপারম্যান'দের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে গিয়ে অনেকে হতাশায় ভোগে। ফ্যাশন সামগ্রীর অতিরিক্ত প্রচার ও তা কিনতে না পারার মানসিক চাপও তরুণদের মধ্যে বিষণ্নতা তৈরি করে।
বিষণ্ণতা কি শুধুই 'ন্যাকামি'?
অনেক পরিবারে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনকে 'দুর্বল মনের লক্ষণ', 'ন্যাকামি' বা 'ঢং' বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ধারণাগুলি সম্পূর্ণ ভুল এবং বিপজ্জনক। সাবধান: মনে রাখবেন, যারা আত্মহত্যার কথা বলে, তারা কখনও আত্মহত্যা করে না—এই ধারণাটিও ভুল। বিষণ্ণতা একটি রোগ, যা ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে যে কারও হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের কড়া ব্যবহার রোগীকে আরও বেশি অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেয়। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে এই রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং নির্ভর চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষিত মনোচিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। মানসিক স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
প্রত্যাশা: হতাশা থেকে মুক্তির ঠিকানা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রী ২২ বছর বয়সেই জীবনকে 'ব্যর্থ জীবন' লিখে বিদায় জানাল, তার কাছে হয়তো জীবনের অমিত সম্ভাবনা পৌঁছায়নি। জীবন সবসময়ই আশাময়। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশা। তরুণ প্রজন্মকে এই আশা, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার আনন্দের কথা জানাতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা জরুরি।
৬.১. এখন প্রয়োজন কাউন্সেলিং সেন্টার
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, অফিস এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অবিলম্বে কাউন্সেলিং সেন্টার প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত কর্মীর মাধ্যমে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য চেকআপ এবং পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা করলে বহু অপমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দিতে হবে।