তথ্যপ্রযুক্তি

অবৈধ ফোনের দিন শেষ, আজ থেকে চালু হলো এনইআইআর

প্রকাশিত: 01 Jan, 2026

ফন্ট সাইজ:
আশরাফ
আশরাফ

জেলা প্রতিনিধি

অবৈধ ফোনের দিন শেষ, আজ থেকে চালু হলো এনইআইআর

দেশের মোবাইল ফোন বাজারে অবৈধ ও আনঅফিশিয়াল হ্যান্ডসেট ব্যবহারে কার্যকর লাগাম টানতে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সব ফোনের আইএমইআই নম্বর যুক্ত হচ্ছে জাতীয় ডাটাবেজে। ফলে চোরাই ও অবৈধ ফোন শনাক্ত করা সহজ হবে।

তবে বিটিআরসি জানিয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সব আনঅফিশিয়াল ফোন বৈধ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সব ফোনের আইএমইআই নম্বর যুক্ত হচ্ছে একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় ডাটাবেজে। ফলে চোরাই বা আনঅফিশিয়াল পথে আসা মোবাইল ফোন শনাক্ত করা সহজ হবে এবং ধাপে ধাপে এসব ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাবে। একইসঙ্গে এখন থেকে নেটওয়ার্কে থাকবে শুধু বৈধ ডিভাইস। যার ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে কমবে অপরাধ ও সাইবার ঝুঁকি। আর মোবাইল নেটওয়ার্কে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানায়, এনইআইআর কার্যকর হওয়ায় এখন থেকে মোবাইল নেটওয়ার্ক হবে শতভাগ বৈধ ডিভাইসভিত্তিক। দেশের ভেতরে উৎপাদিত বা বৈধভাবে আমদানি করা মোবাইল ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত থাকবে। অন্যদিকে, অবৈধ বা অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেট শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈধতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে ফোনটি নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।

এর আগে গত ১৬ ডিসেম্বর এনইআইআর চালুর ঘোষণা দিয়েছিল বিটিআরসি। তবে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সময় বাড়িয়ে ১ জানুয়ারি থেকে সিস্টেমটি চালু করা হয়।

বিটিআরসি কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি এসব অনিবন্ধিত ফোন অপরাধীদের হাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। এনইআইআর চালুর ফলে মোবাইল ফোন ক্লোনিং, চুরি ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত ব্যবহৃত সব ফোন নিবন্ধিত

এনইআইআর চালুর অংশ হিসেবে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত যেসব মোবাইল হ্যান্ডসেট দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সক্রিয় ছিল, সেগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি। কমিশনের সূত্র জানায়, আগে যেসব ফোন অনিবন্ধিত ছিল, সেগুলোও ধাপে ধাপে নিবন্ধনের আওতায় এসেছে।

পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি হ্যান্ডসেটে সংযোগ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অনেক ফোনে নিবন্ধিত দেখালেও কিছু ফোনে তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এসব ফোনও পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসির এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত যেসব হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্কে সক্রিয় ছিল। সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়েছে। কোনো কোনো গ্রাহক এখনো নিবন্ধনের এসএমএস পাননি। এর পেছনে নেটওয়ার্ক কনজেশন বা কারিগরি বিলম্ব থাকতে পারে।

তিনি জানান, বর্তমানে এনইআইআর সিস্টেমে ডাটা মাইগ্রেশনের কাজ চলছে। একসঙ্গে দুই থেকে তিন দিনের তথ্য স্থানান্তরের কারণে কিছু গ্রাহক সাময়িকভাবে ভুল বা বিভ্রান্তিকর বার্তা পেতে পারেন। বিশেষ করে ২৮ ডিসেম্বরের পরের ডাটা এখনো পুরোপুরি মাইগ্রেশন সম্পন্ন হয়নি। মাইগ্রেশন শেষ হলে নিবন্ধনের অবস্থা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে এবং ভুল বার্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধন হয়ে যাবে।

এনইআইআর কমাবে সাইবার অপরাধ, বাড়বে রাজস্ব

এনইআইআর চালু নিয়ে সম্প্রতি বিটিআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, বিভিন্ন সেবা সম্পর্কিত সরকারের ডাটাবেজে অনেক তথ্যের গরমিল থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ মুখে পড়তে হয়। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি হয় অবৈধ ডিভাইস ও সিম থেকে যা এনইআইআর চালুর মাধ্যম কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

অবৈধ হ্যান্ডসেটের কারণে প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনইআইআর কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা নয় বরং এটা রাষ্ট্রীয় ও গ্রাহক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সিমের মাধ্যমে প্রতারণা, আর্থিক লেনদেন জালিয়াতি কমে আসবে।

বিদেশ থেকে আনা ফোনের জন্য ব্যবস্থা থাকবে বিশেষ নিবন্ধনের

বিদেশ থেকে কেনা বা উপহার পাওয়া মোবাইল হ্যান্ডসেট প্রাথমিকভাবে নেটওয়ার্কে সচল থাকবে। এরপর গ্রাহককে এসএমএসের মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য দাখিল করার নির্দেশনা দেওয়া হবে। দাখিল করা তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের মাধ্যমে সচল থাকবে, আর অবৈধ হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।

এই নিবন্ধনের জন্য গ্রাহককে neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং সেখানে Special Registration সেকশনে গিয়ে হ্যান্ডসেটের IMEI নম্বর ও প্রমাণপত্র (যেমন— পাসপোর্ট, ভিসা, ক্রয় রশিদ, কাস্টমস রশিদ ইত্যাদি) আপলোড করতে হবে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার সেন্টার থেকেও এই সেবা নেওয়া যাবে। আর বিদ্যমান ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে নিজের ব্যবহৃত ১টি হ্যান্ডসেট বাদে সর্বোচ্চ ১টি ফোন বিনা শুল্কে এবং আরও ১টি ফোন শুল্ক প্রদান সাপেক্ষে আনতে পারবেন।

কীভাবে জানবেন আপনার ফোন বৈধ কিনা?

বর্তমানে ব্যবহৃত সব হ্যান্ডসেট ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। তবে মোবাইলের অবস্থা জানতে চাইলে সহজেই যাচাই করা যাবে মাত্র ৩ ধাপে —

ধাপ ১. *১৬১৬১# নম্বরে ডায়াল করুন।

ধাপ ২. ১৫ ডিজিটের IMEI নম্বর লিখে প্রেরণ করুন।

ধাপ ৩. ফিরতি মেসেজে জানানো হবে হ্যান্ডসেটটির নিবন্ধন অবস্থা।

এই তথ্য neir.btrc.gov.bd পোর্টাল বা মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার থেকেও জানা যাবে।

নতুন ফোন কেনার আগে যা করবেন

আজ থেকে যেকোনো বিক্রয়কেন্দ্র, অনলাইন বা ই–কমার্স সাইট থেকে নতুন ফোন কেনার আগে অবশ্যই বৈধতা যাচাই করতে হবে। এর জন্য ফোনের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করতে হবে — KYD 15 digit IMEI। তারপর পাঠাতে হবে ১৬০০২ নম্বরে। ফিরতি মেসেজে ফোনটির বৈধতা সম্পর্কে জানানো হবে।

বৈধ হ্যান্ডসেট হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআর সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়ে যাবে।

ফোন বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে ‘ডি-রেজিস্ট্রেশন’ বাধ্যতামূলক

বিটিআরসি বলছে, ১৬ ডিসেম্বর থেকে কোনো গ্রাহক নিজের হ্যান্ডসেট বিক্রি বা হস্তান্তর করতে চাইলে আগে ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

এটি করা যাবে— Citizen Portal, MNO Portal, Mobile Apps বা USSD Channel (*১৬১৬১#) এর মাধ্যমে। তবে ডি-রেজিস্ট্রেশনের সময় গ্রাহকের নিজস্ব NID-এর শেষ চার ডিজিট দিতে হবে। শর্ত অনুযায়ী, হ্যান্ডসেটের সিম অবশ্যই ব্যবহারকারীর নিজের নামে নিবন্ধিত থাকতে হবে।

চুরি বা হারানো ফোন করা যাবে ব্লক ও আনলক

এই সিস্টেম চালু হলে গ্রাহকের মোবাইল চুরি হলে বা হারালে সেটি সহজেই ব্লক করা যাবে। এজন্য এনইআইআর পোর্টাল (neir.btrc.gov.bd), মোবাইল অ্যাপ বা অপারেটরের কাস্টমার সেন্টার থেকে ফোন লক/আনলক করা যাবে। যাদের ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তারাও USSD চ্যানেল বা অপারেটরের ১২১ নম্বরে কল করে সেবা নিতে পারবেন।

মোবাইল উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রিতে মানতে হবে নতুন নিয়ম

বিটিআরসি জানিয়েছে, দেশের চাহিদার বেশিরভাগ মোবাইল এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। তবে কিছু বিশেষ মডেল নিবন্ধিত ভেন্ডরদের মাধ্যমে আমদানি করা হয়। এনইআইআর কার্যকর হওয়ার পর উৎপাদন বা আমদানি করা সব ফোনের আইএমইআই নম্বর কমিশনে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে জমা দিতে হবে।

আইএমইআই জমা না দিলে বৈধভাবে উৎপাদন বা আমদানি করা হ্যান্ডসেটও নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবে না।

একইভাবে, বিক্রেতাদেরও ফোন বিক্রির আগে আইএমইআই যাচাই করতে হবে এবং ফেক বা নকল আইএমইআই যুক্ত ফোন বিক্রি করা যাবে না।

এছাড়া এনইআইআর সম্পর্কিত যেকোনো তথ্য জানতে বিটিআরসির হেল্পডেস্ক নম্বর ১০০ অথবা অপারেটরদের কাস্টমার কেয়ার নম্বর ১২১-এ যোগাযোগও করা যাবে।

আরএইচটি/এসএম

এই পোস্টটি শেয়ার করুন: